ছোটগল্পঃ রানা

 



-------
বর্ণা ভয় পেয়েছিলেন সামনে তাকিয়ে মোহন কে দেখতে পাবেন, কিন্তু দেখলেন বাড়ি নতুন রং করা, মানুষজন কেউ নেই l ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন – ওরা সব কোথায় গেল?
রানা হাসলো – ওদের এজেন্সি মারফত অনেক আগেই অ্যাডভান্স দেওয়া হয়েছে, ওরা ভাড়া বাড়িতে উঠে গেছে, যেমন আমরা একদিন উঠেছিলাম? তারপর বাড়ি সারানো হয়েছে,রং করা হয়েছে– তবে তোমাকে এখানে এনেছি মা, ওদের বসবাসের চিহ্ন এখানে আর কোথাও নেই, তুমি চাইলেই খুব সহজে আবার তোমার নিজের করে নিতে পারবে l
বর্ণা গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন, গভীর ক্ষত নিয়ে এ বাড়ি ছেড়েছিলেন, বিশ্বাসই হচ্ছে না এই বাড়িতে উনি আবার ঢুকতে পারবেন, মনের মধ্যে কত প্রশ্ন, কোনটা ছেড়ে আগে কোনটা করবেন –হ্যাঁ রে রানা,তোর বাবা তোকে চিনতে পেরেছেন?
– না মা, আমি এখন পর্যন্ত তাঁর সাথে দেখা করিনি, তোমাকে বাদ দিয়ে তো আমি তার সাথে দেখা করতে পারি না, ওটাও ঠিক করেছি দুজনে একসাথে করব l এতদিন পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে, এজেন্সিই সব ব্যবস্থা করেছে, বাবার এখন টাকার দরকার, কে কিনছে সেটা তাঁর কাছে বড় কথা নয়, এডভান্স পেয়েই বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন l
রানা এগিয়ে এসে মায়ের হাত ধরল – এসো মা, ভিতরে এসো, আমি কিছুটা সারিয়ে রং করেছি যাতে এ বাড়িতে পা দিতে তোমার খারাপ না লাগে, বাকিটা তোমার কথা মত হবে, তুমি ঠিক করবে তোমার ঘর কোনটা হবে, তোমার নাতনি কোন ঘরটায় থাকবে, বাকি ঘর আমার আর রিয়ার জন্য l
দুজনে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন l সেই সামনের ঘরটা, যেটা বর্ণা খুব যত্ন করে সাজিয়েছিলেন, এখন ভাবলে হাসি পায়, সারাদিন কাজের পরে পিঠ কুঁজো করে সোফার ঢাকনায় সূচ সুতোয় ফুল তুলেছিলেন … কার বাড়ি কে সাজায়! সেই বাড়িতে তার কোন অধিকারই ছিল না, এক কথায় বেরিয়ে যেতে হয়েছিল! সামনের ঘর ছেড়ে ভিতরের দিকে পা বাড়ালেন, সেই ভিতরের ঘর , অনেক হিসাব করে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখী বানিয়েছিলেন, যেখানে মোহন প্রথম মায়ার কথা বলেছিল, যেখানে প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন মধ্যরাত্রে মোহন একতলায় নেমে গেল... স্মৃতিগুলো বড়ই কষ্টের l
রানা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল – মা তোমার ভালো লাগছে না, চলো আমরা বেরিয়ে যাই l
বর্ণা ছেলের হাতে আলতো চাপ দিলেন – বাড়িটা ফাঁকা বলেই ভালো লাগছে না, তোরা সবাই যখন চলে আসবি, লালি যখন এ ঘর ঘর দৌড়ে বেড়াবে, তোকে খুব ভালো লাগবে , চল দোতলায় তোর ঘরটা দেখে আসি l
দুজনে ধীরে ধীরে দোতালায় উঠে এলেন, রানার জন্য ঘর বানিয়েছিলেন, বড় হলে ছেলের আলাদা ঘর লাগবে – সে ঘরে একা রানার কোনদিনই থাকা হয়নি, তার আগেই রানাকে এ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল l
ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন – তুই বললি তোর বাবার টাকার খুব দরকার, কেন ব্যবসা ভালো চলছে না? আগে তো ব্যবসা খুব ভালো চলত!
রানা মার হাত ধরে দোতলার ব্যালকনিতে এলো – দাঁড়াও মা, মল্লিককে কয়েকটা মোড়া কিনতে বলেছিলাম, দেখি কোথায় রেখে গেছে l
রানা মোড়া আনতে গেল, বর্ণা পিছনে হারিয়ে গেলেন, কতদিন ভেবেছিলেন এই ব্যালকনিতে বসে মোহনের সাথে চা খাবেন, চা অবশ্য দু একদিন খেয়েওছিলেন… তারপর দূর থেকে অনেকদিন কল্পনা করেছেন ওই ব্যালকনিতে নিশ্চয়ই মায়া আর মোহন বসে চা খায়, মোহনের নিশ্চয়ই মনেও পড়ে না তার আগেও একটা জীবন আছে, তার একটা সন্তান আছে!
আপনা আপনিই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো, শেষ পর্যন্ত মোহনকে এ বাড়ি বর্ণাকেই ফেরত দিতে হলো, যে বাড়িতে নিজের অধিকারবলে মায়াকে এনে তুলতে পেরেছিলেন, যেখান থেকে অনায়াসে বর্ণাকে ছেলের শুদ্ধ বের করে দিতে পেরেছিলেন, অদৃষ্ট মোহনকেও সেই বাড়ি ভোগ করতে দিল না, মোহনকেও সেই বাড়ি ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে উঠে যেতে হল l
একটা প্রশ্ন মনে হল – মায়া কি আজও মোহনের সাথে আছে? মায়াকেও কি আজকে বাড়িছাড়া হতে হলো? যাবার দিন মায়া বর্ণাকে বলেছিল – স্বামীর অধিকারেই বাড়ি, যদি স্বামীই তোমার না থাকলো, বাড়ি কি করে তোমার হবে? সারাদিন নিজের খেয়ালেই থাকতে, মানুষটার তো যত্নআত্তিই করতে না, তুমি যদি খেয়াল রাখতে তাহলে তার মন কি অন্যদিকে যেত?
হঠাৎ বর্ণার মায়ার সাথে খুব দেখা করতে খুব ইচ্ছে হলো l
রানা মোড়া দুটো খুঁজে পেয়েছে, একটাতে নিজে বসে আর একটা মার দিকে এগিয়ে দিল – তুমি জানো মা বাবার আর একটা ছেলে আছে?
বর্ণা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন – জানিনা,তবে আন্দাজ করেছিলাম l
রানা একটু ইতস্তত করলো, সম্ভবত পরবর্তী প্রশ্নটা করতে একটু অস্বস্তি লাগছে – মা তোমার সাথে বাবার তো ডিভোর্স হয়নি?
বর্ণা মাথা নাড়লেন – না,তবে আমাদের আইনত বিয়েও হয়নি, শুধুমাত্র সামাজিক বিয়েটা হয়েছিল l
রানা মাথা নাড়লো, মানে বুঝেছে – তা হলেও মা ডিভোর্স যখন হয়নি তোমাদের বিয়েটাই এখন পর্যন্ত সিদ্ধ, সে দিক থেকে দ্বিতীয় সন্তান বা দ্বিতীয় বিয়েটা অবৈধ l
বাবা শুধু আমাদের ঠকাননি মা, ওদেরও অনেক অসম্মানের মধ্যে টেনে এনেছেন, মায়া আন্টির কথা বাদ দিচ্ছি, ছেলেটা তো কোন দোষ করেনি, বাবা পেরেছেন তো তাকেও ঠকাতে?
বর্ণা একটু ভেবে বললেন – আমিও অনেকদিন ভেবেছি তোর বাবা ডিভোর্সটা করলো না কেন? মায়ার বাস্তব বুদ্ধি খুব প্রখর ছিল, ওর তো এটা না বোঝার কথা নয়?
রানা একটু অস্বস্তি পাচ্ছে, মার সাথে এ ধরনের কথা ও আগে কোনদিন বলেনি, নিচু গলায় বলল–বাবা ডিভোর্স করলে আমাদের দুজনের জন্য মোটা টাকা খোরপোশ দিতে হতো, ওদিকে বাবার তখন অনেক আয়, আর এদিকে আমি নাবালক, তোমার কোন আয় ছিল না, মনে হয় অনেক চিন্তা করে ওই টাকাটা বাঁচিয়েছিলেন l
এতদিনে বর্ণার হিসাবটা মিলল, কত সহজ হিসাব, কিন্তু কথাটা আগে ওর মাথায় আসেনি, আজকালকার ছেলে মেয়েরা অনেক বেশি ইন্টেলিজেন্ট, রানা কত সহজে কথাটা বুঝে নিয়েছে!
রানা একটু থেমে বলল– আমি এজেন্সির মল্লিকের কাছ থেকে যেটুকু শুনতে পেয়েছি, বাবার ব্যবসা এখন আর ভালো চলছে না, নেক্সট জেনারেশন পড়াশুনা সম্ভবত বিশেষ কিছু করেনি, মোবাইল বা ঐ ধরনের কিছুর বিজনেস করতে চাইছে, সেই টাকাটা জোগাড় করতে বাড়িটা বিক্রির চেষ্টা করছিলেন l আমি অনেক আগে থেকেই বাড়িটা টার্গেট করে রেখেছি,
মল্লিককেও বলা ছিল, কথাটা কানে আসা মাত্র মল্লিক যোগাযোগ করে l
বাবার কাছে খদ্দের পাওয়াটাই বড় কথা ছিল, আমি বাজারদরের থেকে একটু বেশিই দিয়েছি, মল্লিককেও বলা ছিল একটা ভাড়াবাড়ি জোগাড় করে দিতে যাতে এই বাড়িটা খালি হতে দেরি না হয়, অতএব খুব তাড়াতাড়িই ব্যবস্থাটা হয়ে গেছে l
বাবা কে কিনছে সেটা নিয়ে মাথাই ঘামাননি, টাকার এমাউন্টটা নিয়েই শুধু কথা বলেছেন l
বর্ণা গোটা কথাটা শুনে ধীরে ধীরে বললেন – ওর কল্পনাতেও হয়তো আসেনি যাদের ও নিজের জীবন থেকে আগাছার মত তুলে ফেলে দিয়েছিল, যাদের কথা দ্বিতীয়বার মনে করেনি, তারাই আজকে বাড়ি ওর কাছ থেকে কিনে নিতে পারে, খুব ভালো করেছিস রানা, সত্যিই এ বাড়িটা আমার দরকার ছিল, আমার ছেলেকে আমি এ বাড়িতে বড় হতে দিতে পারিনি, আমার নাতনি এ বাড়িতে বড় হবে, তোর জন্য যে ঘরটা বানিয়েছিলাম, লালি ওই ঘরটা পাবে, বাড়ি মানে তো মায়া, সেটা তো শুধু টাকা দিয়ে পাওয়া যায় না, টাকা দিয়ে যেটা দখল করা যায় সেটার নাম হোটেল, এ বাড়ি আমাদের ছিল, আমাদেরই থাকবে l
রানা মায়ের হাতটা নিজের দুটো হাতের মধ্যে তুলে নিল, মার হাতটা অল্প অল্প কাঁপছে.. কে জানে মা, আজকে প্রেসারের ওষুধটা খেয়েছেন কিনা!
দুজনে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলো , তারপর রানা আবার তাগাদা দিল – চলো মা, অফিসের কাজটা মিটিয়ে আসি l
বর্ণা তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – আজকে তোর বাবা আসবেন?
রান্না হাসলো – হ্যাঁ মা, আজকে ওই পাশে উনি একা, আর আমরা এই পাশে দুজন, যেমনটা সেদিনও ছিল, তবে আজকে ভাগ্যের দান বদলে গেছে, আজ উনি দুঃখী, আমরা সুখী l
বর্ণা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন – আমার সেদিনের অসহায় ছেলেটা আজকে কত বড় হয়ে গেছে, কত গভীর ভাবে ভাবতে শিখেছে l
রানা মার চোখটা মুছিয়ে দিল – না মা,তোমার ছেলে কোনদিন অসহায় ছিল না, যার পাশে তোমার মত শক্ত মা থাকে, সে কোনদিন অসহায় হতে পারে না, তবে সেদিন তুমি বড়ো অসহায় ছিলে, বাবার পাহাড় প্রমান বিশ্বাসঘাতকতা আর আমি– দুটোর সাথে তোমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে, আমি চাইবো বাকি জীবনটা যেন তোমাকে আর কোন যুদ্ধ করতে না হয়, বাকি জীবনটা যেন তুমি নিশ্চিন্তে কাটাতে পারো, দায়দায়িত্ব যেন সবটাই আমি আর রিয়া নিতে পারি l
বর্ণা ভেজা চোখে হাসলেন – নিস তো, এখন তো আমার আর কোন চিন্তাই নেই, আগে একটা পয়সার জন্য কত হিসাব করতাম, রিক্সা ভাড়া বাঁচানোর জন্য কতটা পথ হাঁটতাম, এখন তো খরচ করবার সময় হিসাবই করিনা l
রানা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল – না মা,আমি জানি তুমি খুব কষ্টে আছো, আমিও খুব কষ্টে আছি, কিন্তু এই দশ বছর শুধুমাত্র দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করেছি যাতে দেশে ফিরে এসে খুব স্বাভাবিকভাবে একটা ফার্ম খুলে বসতে পারি , টাকার টেনশন না করতে হয় l টাকার টেনশন কাকে বলে তোমাকে দেখে জেনেছি মা, শুধু সেই ব্যবস্থাটুকু করার জন্য এই দশ বছর তোমাকে এখানে একা ফেলে রেখেছি, আর একটা দিনও তুমি একা থাকবে না, রিয়া বলে দিয়েছে এবার তোমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে, পরে তো তুমি আর যেতে পারবে না, আমরা আসার আগে ঘুরে এসো, তারপর সবাই একসাথেই ফিরব, আর কোনদিন তুমি একা থাকবে না, তোমার একা থাকার দিন শেষ l
বর্ণা চোখের জল মুছে বললেন – জানিনা কোন ভাগ্যে তোর মত সন্তান পেয়েছি, একটা মায়ের কাছে এর থেকে বেশি চাহিদার কিছু থাকতে পারে না l তোর বাবার কপাল খারাপ, এই সন্তান পেয়েও হারালো l
রানা মায়ের হাত ধরে গাড়ির দিকে এগোলো l

ছোটগল্পঃ রানা ছোটগল্পঃ রানা Reviewed by শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণ নমঃ(SriSriramthakur O gan Ganer vhovon Youtube channel) on এপ্রিল ০৫, ২০২৫ Rating: 5

কোন মন্তব্য নেই:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.