আমি এক দেওয়াল ঘড়ি
সময় থেমে যায় না, শুধু মানুষ ভুলে যায়
ষাটের দশকে আমার জন্ম হয়েছিল—এক ব্যস্ত শহরের গলির দোকানে। ঝকঝকে কাঁচ, পালিশ করা কাঠের বাক্স, ভিতরে ধাতব দণ্ড আর দাঁতের চাকাগুলো মিলেমিশে আমাকে প্রাণ দিয়েছিল। আমার বুকে ঝোলানো দুলটা দুলে দুলে সেকেন্ড গুনত, আর প্রতিটি ঘণ্টায় আমার ধাতব জিভটা টং টং শব্দে সবাইকে জানিয়ে দিত—সময় কাকে বলে।
তখন বাড়ির সবাই আমাকে নিয়ে কত গর্ব করত! বৈদ্যুতিক ঘড়ি তখনও এত সহজলভ্য হয়নি। আমি ছিলাম ঘরের সম্মান—বড় ঘরে, দাওয়াত খাওয়া অতিথির চোখে প্রথমেই পড়ত আমার ঝকমকে চেহারা। শিশুরা পড়ার টেবিলে বসত, মা রান্নাঘরে সময় মেপে দিতেন, বাবা অফিসের জন্য তৈরি হতেন আমার টিকটিক শব্দের তালে। আমার টুংটাং ধ্বনি মানে ছিল জীবন চলমান।
বছরের পর বছর আমি বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো সবাইকে সময় দিয়েছি। ঘড়ির কাঁটা শুধু সময় নয়, মানুষের স্বপ্ন, দুঃখ, আনন্দ—সব গুনে গিয়েছে আমার বুকে। বাড়ির মেয়ে বিয়ের সাজে উঠেছিল যখন, আমার ঘণ্টাধ্বনি তখনও বাজছিল। কারও শেষ নিঃশ্বাসের সময়ও আমি কাঁটায় কাঁটায় সময় জানিয়ে গেছি।
কিন্তু সময়ের irony—আমি নিজেই একদিন পিছিয়ে পড়লাম। নতুন ইলেকট্রনিক ঘড়ি, ডিজিটাল হাতঘড়ি, তারপর মোবাইল ফোন—সব আমাকে অচল করে দিল। আমার টিকটিক শব্দকে তারা বলল “পুরোনো”, আমার ধাতব ঘণ্টাধ্বনি হারিয়ে গেল টেলিভিশন আর রেডিওর কোলাহলে।
একদিন লক্ষ্য করলাম, আমার চাবি আর কেউ ঘোরায় না। আমি থেমে গেলাম। আমার কাঁটা দাঁড়িয়ে রইল—বারোটার পঁচিশ মিনিটে। সেই মুহূর্ত থেকে আমি যেন শ্বাস হারালাম। ধুলো জমল, কাচ ম্লান হলো, কাঠে পোকা ধরল। দেয়ালের জায়গা থেকে আমাকে নামিয়ে এনে এক কোণে ফেলে রাখা হলো।
আজ আমি আবর্জনার স্তূপে পড়ে আছি—ভাঙা চেয়ার, পুরোনো পেতলের লন্ঠন আর ছেঁড়া বইয়ের সঙ্গে। কেউ আমাকে দেখে না, কেউ আর আমার ঘণ্টাধ্বনি শোনে না। অথচ আমি জানি, আমি শুধু একটি ঘড়ি ছিলাম না—আমি ছিলাম সময়ের সঙ্গী, এক পরিবারের জীবনের নীরব ইতিহাস।
এখন আমি নীরব, কিন্তু মনে মনে ভাবি—যদি আবার কেউ আমাকে মেরামত করে, আবার আমার দুল ঝুলে ওঠে, তবে হয়তো আমি আবার বলব,
“সময় থেমে যায় না, শুধু মানুষ ভুলে যায়।”
ছবিটি সাংকেতিক মাত্র • উৎস: সংগৃহীত
