এক বিদেহীর ডায়েরি |ভূতের গল্প | Funny + Horror Bangla StoryGhost Autobiography 👻 | Ek Videhir Diary

 



​রাত তখন ঠিক দেড়টা। চারিদিক নিঝুম, শুধু আমার টেবিল ল্যাম্পের আলোটা খাতার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে দূর থেকে কোনো এক ট্রাকের হর্নের শব্দ ভেসে আসছে। আমি কলম হাতে মূর্তির মতো বসে আছি। সমস্যা একটাই—'রাইটার্স ব্লক'। কাগজের ওপর কালির একটা আঁচড়ও পড়ছে না।
​গল্পের প্রেক্ষাপট তৈরি—একটা পুরনো জমিদার বাড়ি, ভাঙা পালঙ্ক, আর ঝনঝন শব্দে শিকল টেনে কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তারপর? ভূতটা যখন সামনে আসবে, তখন সে কী করবে? হাড় হিম করা একটা চিৎকার দেবে? নাকি টপ টপ করে তার শরীর থেকে রক্ত ঝরবে? ভাবছি, কিন্তু সবকিছুই বড্ড পুরোনো মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন পাঠকরা পড়ে বলবে, "ধুর! সেই একই তো গল্প।"
​বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করলাম, "আরে বাবা, একটু আলাদা কিছু মাথায় আয়! ভূতেরা কি শুধু ভয় দেখাতেই জানে? অন্য কিছু করতে পারে না?"
​ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ঘরের তাপমাত্রা যেন হঠাত কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। জানলাটা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও পর্দাটা একটু নড়ল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। অন্ধকার কোণ থেকে ধোঁয়ার মতো একটা অবয়ব ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। প্রথমে মনে হলো চোখের ভুল, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই ধোঁয়া একটা মানুষের আকৃতি নিল। তবে মানুষটা ঠিক রক্ত মাংসের নয়, ঈষৎ স্বচ্ছ। পরনে পুরোনো আমলের ধুতি আর পাঞ্জাবি, কাঁধে একটা চাদর। মুখটা গম্ভীর, তবে চোখে একটা বিরক্তিকর ভাব।
​আমি চিৎকার করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর ফুটল না। ভূতটা হাত তুলে ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিল। তারপর বেশ দরাজ গলায় পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠল, "আরে মশাই, থামুন! চ্যাঁচাবেন না। আপনার চ্যাঁচানি শোনার মতো ধৈর্য আমার নেই।"
​আমি তো থ! ভূত কথা বলছে? তাও আবার এমন আধুনিক কায়দায়? তোতলামি করে বললাম, "আ-আপনি কে?"
​ভূতটা আমার সামনের চেয়ারটায় (যেটা খালি ছিল) গটগট করে বসে পড়ল। পা নাচাতে নাচাতে বলল, "আমি কে সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো আপনি কী ভাবছেন ? গত এক ঘণ্টা ধরে দেখছি আপনি ভাবছেন যে আমি নাকি শিকল টেনে হাঁটি? ওরে বাবা! একে তো এই বাতাসের মতো শরীরে দশ কেজির শিকল টানার ক্ষমতা আমার নেই, আর দ্বিতীয়ত, অত শব্দ করলে লোকে তো আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যাবে। ভয়টা দেখাব কখন?"
​আমি আমতা-আমতা করে বললাম, "না, মানে... ওটা তো গল্পের খাতিরে..."
​"রাখুন আপনার গল্পের খাতিরে!" ভূতটা ধমক দিয়ে উঠল। "আপনারা লেখকরা আমাদের মান-সম্মান একদম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। কেউ লিখছেন আমরা নাকি উল্টো পায়ে হাঁটি—আরে ভাই, আমাদের কী পায়ের হাড় নেই? আবার কেউ লিখছেন আমরা নাকি সাদা শাড়ি পরে গাছের ডালে বসে পা ঝোলাই। এই মশার কামড়ে গাছের ডালে কে বসে থাকে মশাই? আর সাদা শাড়ি? আমাদের কি ড্রেসিং সেন্স নেই?"
​আমি অবাক হয়ে তাকালাম। ভূতটা বেশ উত্তেজিত। সে আবার বলতে শুরু করল, "আরে মশাই, আমরা কি অতটাই বোকা? আপনি লিখছেন আমি নাকি রক্তের মতো লাল চোখ নিয়ে খিলখিল করে হাসব। আরে, আমার কনজাংটিভাইটিস হয়নি যে চোখ লাল হবে। আর ওই খিলখিল হাসি? ওটা তো স্রেফ গলার পেশির ব্যায়াম। আসল ভয় তো থাকে নিস্তব্ধতায়, মনস্তাত্ত্বিক খেলায়। কিন্তু আপনারা তো স্রেফ সস্তা মেকআপ দিয়ে আমাদের সং সাজিয়ে রেখেছেন।"
​আমি বুঝতে পারলাম, এ কোনো সাধারণ ভূত নয়। এ রীতিমতো বুদ্ধিজীবী এবং অপমানিত ভূত। আমি একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম, "তাহলে আমি কী লিখব? আপনিই বলুন না।"
​ভূতটা একটু নড়েচড়ে বসল। তার চোখে একটা ঝিলিক খেলে গেল। সে বলল, "অনেক হয়েছে কাল্পনিক ভূত। এবার আমি যা বলব, তা লিখুন। আমার আসল জীবন—মানে মৃত্যুর পরের জীবন। একটা ‘অটোবায়োগ্রাফি’ বা জীবনী বলতে পারেন। নাম দিন ‘এক বিদেহীর ডায়েরি’। লিখুন, আমি ডিক্টেশন দিচ্ছি।"
​আমি যান্ত্রিকের মতো কলম ধরলাম। নতুন পৃষ্ঠা উল্টে নিলাম। ভূতটা চোখ বন্ধ করে স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বলতে শুরু করল...
​"শুরুটা করুন এভাবে—মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং এক অনন্ত ঝামেলার শুরু। আমি যখন মারা গেলাম, ভাবলাম এবার বুঝি শান্তি। কিন্তু কোথায় কী! যমদূত তো দূরের কথা, একটা গাইডও এল না রাস্তা দেখাতে। আমি আমার নিজের নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার আত্মীয়রা তখন বিলাপের বদলে আলোচনা করছে শ্রাদ্ধে পটল ভাজা দেবে নাকি বেগুন ভাজা।"
​আমি লিখতে লিখতে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। ভূতটা গম্ভীরভাবে বলে চলল, "লিখুন, ভূতেদের দুনিয়ায় সবথেকে বড় সমস্যা হলো বাসস্থান। মানুষ বাড়ছে, পুরনো বাড়ি ভাঙছে, গাছপালা কেটে ফ্ল্যাট হচ্ছে। আমরা যারা পুরনো কায়দার ভূত, তারা এখন যাব কোথায়? সেদিন এক বহুতলে ঢুকেছিলাম একটু ভয় দেখাতে। লিফটে উঠেছি, হঠাত দেখি সেন্সর আমাকে ধরতেই পারছে না। দরজা খুলছে না, বন্ধও হচ্ছে না। শেষে এক ডেলিভারি বয়ের সাথে গাদাগাদি করে বের হতে হলো।"
​আমি প্রশ্ন করলাম, "আচ্ছা, আপনারা কি সত্যিই অদৃশ্য হতে পারেন?"
​ভূতটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "পারি। কিন্তু সেটা বড় ক্লান্তিকর। অনেক এনার্জি লাগে। যেমন ধরুন, এই যে আপনার সামনে বসে আছি, এতেও ক্যালরি খরচ হচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই, প্রতিবাদটা জানানো দরকার ছিল। লোকে আমাদের নিয়ে যা খুশি লিখবে, আর আমরা মুখ বুজে সহ্য করব?"
​সে বলতে লাগল তার এক বন্ধুর গল্প। যে নাকি এক আইটি ইঞ্জিনিয়ারের ল্যাপটপে ঢুকেছিল ভয় দেখাতে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ভয় পাওয়ার বদলে ভাবলেন ওটা বুঝি কোনো ‘ভাইরাস’। সে তক্ষুণি অ্যান্টি-ভাইরাস চালিয়ে আমার সেই বন্ধুর বারোটা বাজিয়ে দিল। বন্ধুটি এখন নাকি পেনড্রাইভে বন্দি হয়ে ঘুরছে।
​গল্পটা শুনতে শুনতে আমি ভুলেই গেলাম যে আমার সামনে একজন মৃত মানুষ বসে আছে। সে তার জীবনের ছোট ছোট দুঃখের কথা বলছিল—কীভাবে তারা একলা দুপুরে স্মৃতির ভারে কষ্ট পায়, কীভাবে আধুনিক মানুষের স্মার্টফোনের আলো তাদের ভয় দেখানোর প্রচেষ্টাকে ফিকে করে দিচ্ছে।
​রাত বাড়তে লাগল। ঘড়িতে তিনটে। ভূতটা এবার একটু উদাস হয়ে বলল, "জানেন লেখক সাহেব, আমাদেরও একটা সমাজ আছে। সেখানেও দলাদলি আছে। ব্রহ্মদৈত্যরা ভাবে তারা উচ্চবিত্ত, আর মেছোভূতেরা হলো নিম্নবিত্ত। শাঁকচুন্নিরা তো সব সময় মেকআপ নিয়ে ব্যস্ত। অথচ বাইরের পৃথিবী মনে করে আমরা সবাই এক।"
​আমি বললাম, "আপনার এই জীবনী যদি আমি প্রকাশ করি, মানুষ কিন্তু আপনাকে অন্য চোখে দেখবে।"
​ভূতটা একটু হাসল। ম্লান হাসি। "দেখুক। লোকে জানুক যে ভূতেরাও অভিমান করে। জানুক যে আমরা মরে গেলেও আমাদের অনুভূতিগুলো মরে যায় না।"
​হঠাত বাইরে ভোরের প্রথম পাখির ডাক শোনা গেল। ভোরের হালকা আলো জানলার পর্দা চিরে ঘরে ঢুকল। ভূতটা একটু ছটফট করে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "আজকের মতো এটুকুই থাক। জীবনীটা অনেক বড় হবে। কাল আবার আসব ঠিক এই সময়ে।"
​আমি বললাম, "প্লিজ আসবেন। গল্পের শেষটা কিন্তু আমাকেই করতে হবে।"
​সে দেওয়ালে মিশে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘুরে তাকাল। "শুনুন, ওই শিকল টানা আর সাদা শাড়ির ব্যাপারটা কিন্তু আর লিখবেন না। ওটা বড্ড সেকেলে।"
​পরের মুহূর্তেই ঘরটা খালি। শুধু আমার খাতাটা পাতায় পাতায় ভরে গেছে এক অদ্ভুত জীবন কাহিনীতে। আমি জানলাটা খুলে দিলাম। ভোরের শীতল হাওয়া ঘরে ঢুকল। আমার রাইটার্স ব্লক কেটে গেছে। তবে এখন একটা নতুন চিন্তা—এই পান্ডুলিপি যদি কোনো পাবলিশারকে দিই, সে কি বিশ্বাস করবে যে এটা একটা আসলি ভূতের ডিক্টেশন?
​যাই হোক, কলমটা রাখলাম। কাল রাতে আবার দেখা হবে। আমার নতুন বন্ধুর সাথে। যার পায়ে শিকল নেই, কিন্তু হৃদয়ে এক আকাশ অভিমান আছে।
পরেরদিনটা কাটল এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। স্কুলের ক্লাসে বসে যখন ছাত্রদের ইংরেজি গ্রামার পড়াচ্ছিলাম, বারবার মনে হচ্ছিল—আমার সামনের ওই লাস্ট বেঞ্চের ছেলেটা কি মানুষ? নাকি ওটাও কোনো ছদ্মবেশী ভূত? কাল রাতের সেই আগন্তুক আমার চিন্তাভাবনাটাই পাল্টে দিয়েছে।
​রাত ঠিক দেড়টা। আমি তৈরি হয়ে বসে আছি। সামনে নতুন এক দিস্তা কাগজ, সযত্নে রাখা ফাউন্টেন পেন, আর এক কাপ কড়া লিকার চা। ঠিক যেন কোনো ইন্টারভিউ সেশন। ঠিক ১টা ৩১ মিনিট। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকটা আজ যেন একটু বেশিই ছন্দময়। টেবিল ল্যাম্পের হলুদ আলোয় খাতার সাদা পাতাটা খাঁ খাঁ করছে। ঠিক তখনই ঘরের কোণে সেই পরিচিত ধোঁয়াটা ঘনীভূত হতে শুরু করল।
​সেকেন্ডের মধ্যেই চেয়ারে এসে বসলেন আমার সেই বিদেহী বন্ধু। আজ তাঁর চাদরটা কাঁধ থেকে ঝুলে মাটিতে ঠেকছে, আর মাথায় একটা পুরনো আমলের গোল টুপি। আমায় দেখেই তিনি একগাল হেসে দিলেন। কিন্তু সে হাসি মানুষের মতো নয়, দাঁতগুলো যেন একটু বেশিই সাদা আর ধারালো।
​তিনি মুখ খুলতেই ঘরটা গমগম করে উঠল পূর্ববঙ্গীয় টানে, "কী গো লেখক সাব? আইজ কিন্তু আরও জম্পেশ কিসসা শুনন লাগব। খাতা লন, কলম লন, দেহি আপনার হাত কত দ্রুত চলে!"ওনার কথা শুনে আমি একটু অবাক হলাম।
"দেখুন, আমার জন্ম বাংলাদেশের ঢাকায়।
তাই যদি আমি আমার গল্পটা বাঙাল ভাষায় বলি, তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?"
​আমি একটু হেসে বললাম, "কোনো সমস্যা নেই, আমি একদম তৈরি। তবে কালকের অভিযোগগুলো বাদ দিয়ে আজ বরং আপনার মৃত্যুর ঠিক পরের অভিজ্ঞতার কথা বলুন। মানে, ওপারে যাওয়ার পর ঠিক কী কী হলো?"
​ভূত সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নড়েচড়ে বসলেন। তারপর শুরু করলেন তাঁর জবানবন্দি:
​"আরে হেই কথা আর কইয়েন না! মরনডা তো হইল স্রেফ একখান শুরু। আমি যখন দেহ থিকা আলগা হইলাম, ভাবলাম আপদ বিদায় হইল, এবার বুঝি ডানা গইজাইয়া আকাশে উড়ুম। কিন্তু কই কী! দেহ থিকা বাইর হইয়াই দেহি আমি আমার নিজেরই খাটিয়ার পাশে খাড়ায়া রইছি। আমার গিন্নি চিল্লাইয়া কানতাছে, আর আমার ছোট পোলডায় কারে যেন ফোন কইরা জিগাইতাছে— ‘বাবা তো গ্যাছে গা, এখন বাবার কাজে রুই মাছ দিমু না কি কাতলা মাছের কালিয়া?’ কন তো দেহি, এইটা সহ্য হয়? আমি পাশে খাড়ায়া চিল্লাইলাম— ‘আরে হাভাতের দল, আমি জ্যান্ত থাকতে এক পিস মাছের পেটি পাই নাই, আর এখন আমার নামে কালিয়া খাওয়াইবি?’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমার কথা ওগো কানে তো যায়ই না, উল্টা মনে হইল আমি বাতাসের লগে কুস্তি করতাছি।"
​আমি কলম চালিয়ে যাচ্ছি দ্রুতগতিতে। ভূত সাহেব উত্তেজিত হয়ে হাত-পা নেড়ে বলতে লাগলেন:
​"হ হ, এরপরেই আসল মজা। আমি ভাবলাম যমদূত আইব, মহিষের পিঠে চড়াইয়া নিয়া যাইব। কিন্তু আইল একখান বিটকেল ছোকরা। পরনে নীল রঙের টি-শার্ট, হাতে একখান ট্যাব। আইসাই আমারে জিগায়— ‘নাম কী?’ আমি কইলাম— ‘বিমলাকান্ত চাটুজ্জে’। সে ট্যাবে খুটখুট কইরা আঙুল চালাইয়া কয়— ‘চাটুজ্জে সাব, আপনার তো লিঙ্কে গণ্ডগোল আছে। সার্ভার ডাউন, আপনারে এখন নিতে পারুম না। আপনি আপাতত এইখানেই ওয়েটিং লিস্টে থাকেন।’
​কন তো দেহি, মইরাও শান্তি নাই! আমি কইলাম— ‘ওরে ছোকরা, সার্ভার ডাউন মানে কী? আমি কি বিএসএনএল-এর ব্রডব্যান্ড নাকি যে যখন-তখন ডাউন হইয়া যামু?’ সে একখান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়া অদৃশ্য হইয়া গেল। আমি ওই শ্মশানের একখান পোড়া কাঠের ওপর বইসা পড়লাম।পাশে দেহি আরও ডজনখানেক ভূত বইসা আছে। কেউ বিড়ি টানতাছে (অবশ্য বিড়ির ধোঁয়া নাই, শুধু গন্ধ), কেউ আবার নিজের মরা স্ত্রীকে গাইল পাড়তাছে।"
​আমি হেসে ফেললাম। "বলেন কী! ভূতেরাও ওয়েটিং লিস্টে থাকে?"
​"আরে থাহে মানে? এক্কেবারে লোকাল ট্রেনের প্যাসেঞ্জারের মতো অবস্থা! হেই শ্মশানে আমার লগে দেখা হইল এক ভূতের। নাম তার কলিমুদ্দিন। সে আমারে দেইখাই কয়— ‘ও বাউ, আপনেও নিচে আটকে গেছেন? যমের দুয়ারে এখন খুব ভিড়, সিন্ডিকেট চলতাছে!’ আমি তো থ! কলিমুদ্দিন কইল, ইদানীং মানুষ এত বেশি মরতাছে যে পরকালেও নাকি হাউজিং সমস্যা দেখা দিছে। নরকেও সিট নাই, স্বর্গেও জায়গা নাই। তাই আমাগো মতো যারা ‘মিডিয়াম ক্যাটাগরি’র পাপী-পুণ্যবান, তাগোরে নাকি এই দুনিয়াতেই ঘুইরা বেড়াইতে হয় যতক্ষণ না ওপর থিকা সিগন্যাল আসে।"
​ভূত সাহেব এবার চেয়ারটা আরও কাছে টেনে আনলেন। তাঁর চোখের মণি দুটো হঠাৎ একটু লালচে হয়ে উঠল, কিন্তু তাতে ভয় নেই, বরং এক অদ্ভুত কৌতুক আছে।
​"এরপরে যা হইল হেইডা আরও মারাত্মক। তিন দিন বাদে হেই নীল টি-শার্ট পরা যমদূত আবার আইল। আইসা কয়— ‘চাটুজ্জে সাব, ইন্টারভিউ দিতে হইব।’ আমি জিগাইলাম— ‘কিসের ইন্টারভিউ? আমি কি ব্যাংকের ক্যাশিয়ারি করুম নাকি?’ সে কয়— ‘না, আপনি স্বর্গে যাইবেন না কি নরকে, হেইডা আপনার ইন্টারভিউ দেইখা ঠিক করা হইব।’
​আমারে নিয়া যাওয়া হইল এক বিশাল হলঘরে। সামনে বইসা আছে তিনজনা যমদূত। মাঝখানের জনের দাড়ি এক্কেবারে নাভি পর্যন্ত। সে আমারে জিগায়— ‘চাটুজ্জে, জীবনে সবচাইতে বড় পুণ্য কী করছো?’ আমি কইলাম— ‘কর্তা, জীবনে কত গরিবরে খাওয়াইছি, কত অন্ধরে রাস্তা পার করাইছি!’ সে হুঙ্কার দিয়া কয়— ‘ওসব পুরান গপ্পো বাদ দাও। গত নির্বাচনে কারে ভোট দিছিলা হেইডা কও!’ কন তো দেহি, পরকালেও পলিটিক্স! আমি তো ডরে ঘামতাছি (অবশ্য ভূতের ঘাম নাই, শরীরটা একটু বেশি স্বচ্ছ হইয়া যায় আর কি)। আমি কাচুমাচু হইয়া কইলাম— ‘কর্তা, আমি তো ছাপ্পা ভোট দিছিলাম দুইবার!’ ব্যস, মাঝখানের জন খুশিতে ডগমগ হইয়া কয়— ‘বাহ! তুমি তো তাইলে স্পেশাল ক্যাটাগরি। তোমার লাইগা নরকের ভিআইপি ব্লক বরাদ্দ।’"
​আমি হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। বললাম, "তারপর? আপনি কি নরকেই গেলেন?"
​ভূত সাহেব একটা ফুঁ দিলেন। জানলার পর্দাটা সপাৎ করে নড়ে উঠল। "আরে ধুর! নরকে যাই নাই। ওই যে কইলাম না, সিন্ডিকেট! যাওয়ার পথে কলিমুদ্দিন আমারে হাত ধইরা টানল। কয়— ‘চাটুজ্জে ভাই, যাইয়েন না। নরকের ভিআইপি ব্লকেও ইদানীং খুব মশা, আর তার ওপর তপ্ত কড়াইয়ে ভাজার সময় ওরা সর্ষের তেলের বদলে পাম অয়েল দিতাছে। শরীর খারাপ করব। তার চেয়ে চলেন আমরা দুনিয়াতেই থাকি। মানুষের ঘাড়ে চাপুম না, শুধু একটু ডরাইয়া দিমু আর ফ্রিতে ড্রামা দেখুম।’
​আমিও ভাবলাম, হ হ, কলিমুদ্দিন তো ঠিকই কইছে। পরকালের ঝামেলার থিকা এই মর্ত্যলোক অনেক ভালো। অন্তত ডরাইয়া দিলে মানুষ যা রিঅ্যাকশন দেয়, হেইডা দেইখাই পেট ভইরা যায়। একবার এক বাড়িতে ঢুকলাম রাত দুপুরে। দেহি এক জোয়ান পোলা ল্যাপটপে কী যেন দেখতাছে। আমি তার কানের কাছে গিয়া কইলাম— ‘খোকা, ঘুমাও না ক্যান?’ পোলাডায় ডর পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টা আমার দিকে না তাকাইয়া কয়— ‘আরে বাবা, ডিস্টার্ব কইরো না তো, অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে দাও!’ কন দেহি, আমাগো কোনো ইজ্জত আছে?"
​আমি লিখতে লিখতে হাফিয়ে গেছি। সত্যিই তো, প্রযুক্তির যুগে ভূতেদের দশা কাহিল। ভূত সাহেব এবার একটা আড়মোড়া ভাঙলেন। তাঁর হাড়ের কড়কড় শব্দটা ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল।
​"আইজ এইটুকুই লিখেন লেখক সাব। হাত তো মনে হয় ব্যথা হইয়া গ্যাছে। তবে একটা কথা বইলা যাই— পরকালটা কিন্তু মোটেও ওই পুরাণে যা লিখছে হেইরকম না। ওখানেও এখন ওয়াই-ফাই লাগানোর কথা চলতাছে। চিত্রগুপ্ত এখন আর খাতা কলমে হিসাব রাখে না, সব ক্লাউড স্টোরেজে সেভ করে। আর যমরাজ? সে নাকি এখন মহিষ ছাইড়া দিয়া নতুন এসইউভি কিননের ধান্দা করতাছে।"
​তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ভোরের আলো ফুটতে আর দেরি নেই। তিনি যাওয়ার আগে আমার পিঠে একটা ঠান্ডা হাত রাখলেন। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার।
​"কাইল কিন্তু আসল কথা কমু— ভূতেদের প্রেম আর বিয়ার কিসসা। শুনলে আপনার কলম থাইকা কালি ঝরবে না, স্রেফ মধু ঝরবে! আসি তাইলে, জয় মা কালী!"
​বলতে বলতেই তিনি জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি খাতার দিকে তাকালাম। তেরোশো শব্দের ওপর লেখা হয়ে গেছে। কালকের সেই বিরক্তিকর ভাবটা এক্কেবারে উধাও। সত্যিই তো, মৃত্যুর পরেও যদি এত রসদ থাকে জীবনে, তবে তো মরতেও ভয় নেই!
​আমি খাতাটা বন্ধ করে জানলার দিকে তাকালাম। আকাশটা ফর্সা হচ্ছে। আন্দুলের এই ব্যস্ত শহরটা জেগে ওঠার আগেই আমার অলৌকিক বন্ধুটি তার গোপন আস্তানায় ফিরে গেছে। কিন্তু তার সেই ‘বাঙাল’ টানের হাসিটা এখনো আমার কানে বাজছে।
পরেরদিন ​রাত ঠিক দেড়টা। আজ আর ধোঁয়া নয়, ভূত সাহেব সরাসরি জানলার গ্রিল ভেধ করে ভিতরে ঢুকলেন যেন কোনো এক সার্কাসের খেলোয়াড়। আমায় দেখেই খিলখিল করে হেসে উঠলেন। তবে সেই হাসিতে আজ কোনো বিদ্রূপ নেই, আছে এক বুক ভরা নস্টালজিয়া।
​তিনি গটগট করে চেয়ারে বসে বললেন, "কী গো লেখক সাব? আইজ তো আমারে এক্কেবারে বিদায় দিয়া দিবেন? তা শেষ বেলাতে একটু মিষ্টিমুখ করাইবেন না? অবশ্য আমাগো তো মুখ নাই, স্রেফ বাতাসের ঘ্রাণেই পেট ভইরা যায়। লন, খাতা খোলেন। আইজ শোনাই আমার 'মন-পাগল করা' প্রেমের কাহিনি!"
​আমি কলম বাগিয়ে ধরলাম। তিনি শুরু করলেন:
​"আরে হেই কথা আর কইয়েন না! তখন আমি নতুন নতুন ভূত হইছি। শ্মশানের একখান তেঁতুল গাছে বাসা বাঁধছি। পাশেই আছিল এক পুকুর পাড়, যেখানে এক শাঁকচুন্নি থাইকত—নাম তার 'ফুলকুমারী'। ওরে বাবা! কী রূপ তার! গায়ের রঙটা ছিল এক্কেবারে জোছনার মতো সাদা, আর চুলগুলা ছিল যেন ঘন কালো মেঘের মত। সে যখন রাতে মাছ ধরতে পুকুরে নামত, আমি তেঁতুল গাছের ডাল থিকা উইকিপিডিয়ার মতো তার দিকে চাইয়া থাকতাম।
​একদিন সাহস কইরা তারে গিয়া কইলাম— 'ফুলকুমারী দিদি, একখান কথা কমু?' সে আমার দিকে লাল টকটকে চোখ ঘুরাইয়া কয়— 'কী কথা? মাছ ভাগ চাই নাকি?' আমি কইলাম— 'না না, মাছ না। আপনারে দেইখা আমার হৃদপিণ্ডটা (যদিও হেইডা তখন পুইড়া ছাই হইয়া গ্যাছে) আবার ধুকপুক করতাছে। আমাগো কি প্রেম হইতে পারে না?'"
​আমি হাসতে হাসতে লিখছি। ভূত সাহেব উত্তেজিত হয়ে হাত নাড়ছেন:
​"ফুলকুমারী একখান বিটকেল হাসি দিয়া কয়— 'প্রেম করবা? আমার বাবা কিন্তু বড় তান্ত্রিকের ভূত। জানলে তোমারে স্রেফ ডিলেট করে দেবে!' আমি কইলাম— 'তা দিক । আপনার প্রেমে আমি দরকার হইলে রিসাইকেল বিন-এ পইড়া থাকুম!' ব্যস, শুরু হইল আমাগো প্রেম। আমাগো ডেটিং আছিল শ্মশানের পেছন দিকে, যেখানে কেউ যায় না। আমরা চাঁদনি রাতে গিয়া মরা মানুষের হাড় দিয়া খেলতাম। আমার খেলা দেইখা , ফুলকুমারী খিলখিল কইরা হাসত—আর হেই হাসিতে আশেপাশের তিন গ্রাম লোক ভাবত ভূমিকম্প হইতাছে!"
​আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর? বিয়ে হলো?"
​"হ হ, বিয়া তো হইলই! কিন্তু হেই বিয়া কি আর মানুষের মতো? আমাগো বিয়া দিলো এক বুড়া ব্রহ্মদেত্য। মন্ত্র আছিল— 'যাবত চন্দ্র দিবাকরৌ, যতদিন মোবাইল চার্জে থাকিবে, ততদিন তোমরা এক আত্মা হইয়া ভূত-ভবিষ্যৎ এক করিবা।' পণের বদলে পাইলাম একখান ভাঙা হ্যারিকেন আর তিন কেজি জ্যান্ত চুনো মাছ। বিয়ার আসরে গান গাইছিল এক মেছোভূত। কী গলা তার! শুনলে যমরাজও কান টাইপা ধরব।
​কিন্তু বিয়ার পরেই শুরু হইল হ্যাপা। ফুলকুমারী কয়— 'এই তেঁতুল গাছে আর থাকুম না। আইজকাল মশার কামড়ে টেকা যায় না। আমারে একখান বড় অট্টালিকার ছাদে নিয়া চলো।' আমি তারে নিয়া গেলাম এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে। কিন্তু কপাল খারাপ! তিন দিনের মাথায় দেখি একদল সিনেমার লোক আইসা হাজির। ওগো ক্যামেরার ফ্ল্যাশে আমার ফুলকুমারীর ঘুম এক্কেবারে নষ্ট হইয়া গেল। সে রাগ কইরা বাপের বাড়ি চইলা গেল। কইল— 'যে ভূত নিজের গিন্নিরে একখান প্রাইভেট ছাদ দিতে পারে না, তার লগে আর সংসার নাই!'"
​ভূত সাহেবের গলার স্বরটা হঠাৎ একটু ভারী হয়ে এল। তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
​"হেই থিকা আমি একলা ঘুইরা বেড়াই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়া দেহি ওগো প্রেম-ভালোবাসা। মানুষ কত সহজে বিচ্ছেদ করে, আবার নতুন কইরা প্রেমে পড়ে। আমাগো তো হেই সুযোগ নাই। একবার ভূত হইলে অনন্তকাল ধইরা ওই একই স্মৃতি লইয়া থাহন লাগে। তাই তো আপনের কাছে আইলাম। অন্তত লোকে জানুক যে ভূতেরাও কাঁদে, ওগোও হাড়ের ভেতরে একখান মন আছে।"
​বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। জানলার বাইরে আন্দুলের আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। ভূত সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আজ তাঁকে আর স্বচ্ছ মনে হচ্ছে না, যেন ভোরের কুয়াশায় মিশে যাওয়া এক ছায়া।
​তিনি ম্লান হেসে বললেন, "লেখক সাব, অনেক লিখলেন। আমার এই ডায়েরিটা যখন বই হইয়া বাজারে আসব, তখন দেখবেন মানুষ আর আমাগো ডরাইব না। ওগো মনে একটু মায়া জাগব। আমি যাই তাইলে। আমার ফুলকুমারীর খোঁজে আবার একটু বের হইতে হইব। যদি তারে বুঝাইয়া আবার ফিরায় আনতে পারি!"
​আমি হাত বাড়িয়ে তাঁকে ছুঁতে গেলাম, কিন্তু হাতের তেলোয় শুধু শীতল হাওয়ার একটা ঝাপটা লাগল। তিনি জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘাড় ঘুরালেন।
​"শুনেন লেখক সাব— জীবনের গল্প শেষ হয় না। আমার গল্পও শেষ হইল না। কোনো এক অন্ধকার রাতে যদি দেখেন আপনার ল্যাপটপের কার্সারটা একা একা নড়তাছে, বুঝবেন আমি আইছি। ভুল ত্রুটি হইলে কিন্তু এডিট কইরা দিয়েন! আসি তাইলে... ভালো থাহেন!"
​পরের মুহূর্তেই ঘরটা ফাঁকা। টেবিলের ওপর খাতাটা খোলা পড়ে আছে, সেখানে লেখা শেষ হয়েছে— "সমাপ্ত"। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটাই বোধহয় এক নতুন বন্ধুত্বের শুরু। খাতাটা বন্ধ করে আমি একটা লম্বা হাই তুললাম। কাল সকালে যখন এই লেখা পাবলিশারকে দেব, সে হয়তো ভাববে এটা আমার কল্পনা। কিন্তু আমি জানি, আমার কলমের প্রতিটি আঁচড়ে মিশে আছে এক অভিমানী বিদেহীর 'বাঙাল' হৃদয়ের স্পন্দন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন